রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি গড়ে তুলতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে স্বয়ংক্রিয় অতিবেগুনি রশ্মিভিত্তিক কৃষি রোবট। যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তিতে রাতের বেলায় রোবট ফসলের সারির মাঝ দিয়ে চলাচল করে নির্দিষ্ট মাত্রার অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণুর বংশবিস্তার দমন করতে সহায়তা করে। এভাবে অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। বহু বছর ধরে হাসপাতাল, গবেষণাগার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থায় জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহৃত একই বৈজ্ঞানিক নীতিকে এবার কৃষিক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে অনেক রোগজীবাণু প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে আগের তুলনায় আরও বেশি বা আরও শক্তিশালী কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। নতুন রোবটটি দিনের পরিবর্তে শুধুমাত্র রাতের বেলায় কাজ করে, কারণ সূর্যের আলো অনেক অণুজীবকে ক্ষতিগ্রস্ত জিনগত উপাদান পুনর্গঠন করতে সহায়তা করে। রাতের অন্ধকারে নির্দিষ্ট মাত্রার অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগের ফলে রোগজীবাণুর পুনরুদ্ধারের সুযোগ কমে যায় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
এই রোবটে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় চলাচল ব্যবস্থা, উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তি, চিত্রগ্রহণ ব্যবস্থা, সংবেদনশীল শনাক্তকারী, দৃশ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে রোবট নিজেই ফসলের সারি শনাক্ত করে নির্ভুলভাবে চলাচল করতে পারে এবং মানুষের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই পুরো রাত কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্ট্রবেরি খামারে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার চলছে। প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় ভবিষ্যতে আঙুর, টমেটো, বিভিন্ন সবজি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলেও এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, নির্ধারিত মাত্রা, দূরত্ব ও সময় মেনে অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগ করলে গাছের স্থায়ী ক্ষতি হয় না। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তিতে কোনো রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ তৈরি না হওয়ায় খাদ্যে রাসায়নিকের উপস্থিতি, মাটি ও পানিদূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একাই সব ধরনের রোগ, পোকামাকড় বা আগাছার সমাধান নয়। বরং উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা, জৈব নিয়ন্ত্রণ, রোগপ্রতিরোধী জাত এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমিত রাসায়নিক ব্যবহারের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই প্রযুক্তি সর্বোচ্চ কার্যকারিতা দিতে পারে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে স্থানীয় পরিবেশ ও ক্ষুদ্র কৃষিজমির উপযোগী স্বল্পমূল্যের রোবট তৈরি, গবেষণা, সরকারি সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিরাপদ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।