যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি সই হওয়ার সময় মূল লক্ষ্য ছিল—মার্কিন বাজারে সম্ভাব্য আরও কঠিন শুল্কের চাপ কমানো এবং একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সই হওয়া Agreement on Reciprocal Trade অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ reciprocal tariff রাখে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও পোশাকের জন্য শূন্য reciprocal tariff-এর একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির আইনি ভিত্তিই বদলে গেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, International Emergency Economic Powers Act (IEEPA) প্রেসিডেন্টকে এভাবে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। ফলে যে পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ চুক্তিতে গিয়েছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদলে যায়।
এখন তাই প্রশ্ন উঠছে—পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি চুক্তিটির সুবিধা-অসুবিধা নতুন করে মূল্যায়ন করবে?
একদিকে মার্কিন পণ্যের বাজার খুলছে, অন্যদিকে রপ্তানি সুবিধা কতটা নিশ্চিত?
চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আইসিটি পণ্য, জ্বালানি, সয়া, দুগ্ধপণ্য, গরু ও মুরগির মাংসসহ বিভিন্ন পণ্য।
চুক্তির বাণিজ্যিক অংশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের বিমান কেনা এবং কৃষিপণ্য ও জ্বালানি আমদানির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য এবং ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব আমদানির বড় অংশ বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পণ্য—এটি বিবেচনায় রাখা জরুরি। ফলে প্রতিটি মার্কিন পণ্য কেনাকাটাকে সরাসরি ‘চুক্তির বিনিময়ে দেওয়া ছাড়’ হিসেবে দেখা যাবে না।
বরং মূল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এর বিনিময়ে কী পরিমাণ এবং কতটা স্থায়ী সুবিধা পাচ্ছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তৈরি পোশাক
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তৈরি পোশাক। অথচ ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মূল্য ৬.৫০ শতাংশ কমেছে এবং একই সময়ে চালানের পরিমাণ কমেছে ৪.৩৪ শতাংশ। এই সময় পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও ২.২৬ শতাংশ কমেছে।
এখানে চুক্তির ৫.৩ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও পোশাককে শূন্য reciprocal tariff সুবিধা দেওয়ার জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই সুবিধার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।
অর্থাৎ কাগজে সুবিধাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে—কত পরিমাণ পোশাক এই সুবিধার আওতায় আসবে, কোন পণ্য যোগ্য হবে এবং ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে তার ওপর।
চুক্তির ভারসাম্য নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে?
চুক্তির কাঠামোতে বাংলাদেশের বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাজারসুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমানো, মার্কিন মানদণ্ড গ্রহণ, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন সার্টিফিকেশন স্বীকৃতি, কাস্টমস ডিজিটালাইজেশনসহ একাধিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি সুবিধা—নির্দিষ্ট টেক্সটাইল ও পোশাকের শূন্য শুল্ক—একটি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকর হওয়ার কথা।
এ কারণেই কিছু বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষক মনে করছেন, চুক্তিটির বাস্তব সুবিধা ও ব্যয়ের হিসাব নতুন করে করা প্রয়োজন। দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণেও চুক্তিটির শর্ত ও পরিবর্তিত মার্কিন শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বদলে গেছে হিসাব
চুক্তির সময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ reciprocal tariff-এর ঝুঁকি কমানো। চুক্তির মাধ্যমে হারটি ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছিল।
কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট IEEPA-এর অধীনে আরোপিত ব্যাপক শুল্ককে আইনি ক্ষমতার সীমার বাইরে বলে রায় দেওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর বাংলাদেশ সরকারও ওয়াশিংটনের কাছে চুক্তিটির ওপর রায়ের প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্টতা চাওয়ার উদ্যোগ নেয়।
