৪ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এক টেবিলে কূটনীতিক, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, গবেষক, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ এবং তরুণ নেতৃত্ব। আলোচনার কেন্দ্র—বঙ্গোপসাগর, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সমুদ্র নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, কৌশলগত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি।
নাম—বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬, সংক্ষেপে বিওবিসি। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বা সিজিএস। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এতে শতাধিক দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ রয়েছে; প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০-এর বেশি প্রতিনিধি এবং ১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হয়েছেন।
দেখতে এটি একটি আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক সংলাপ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য প্রশ্নটা শুধু—“কে কী বললেন?”—এখানেই শেষ হওয়ার কথা নয়।
কারণ বিওবিসির প্রকাশিত কাঠামোতেই বলা হয়েছে, সম্মেলনটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সমুদ্র নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, শাসনব্যবস্থা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, আয়োজকরা বলেছেন—এই মঞ্চের উদ্দেশ্য শুধু পরিবর্তিত বিশ্বকে বোঝা নয়; বরং নীতিনির্ধারণী চিন্তায় অবদান রাখা এবং ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও উদীয়মান নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর শুধু একটি সম্মেলনের নয়। প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে নীতিনির্ধারণী আলোচনা তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করছে?
আয়োজনের অর্থের উৎস কোথায়?
বিওবিসির সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের অংশীদার ও সহায়তাকারী হিসেবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, চ্যানেল আই, রবি এবং গ্রামীণফোনের নাম রয়েছে।
কিন্তু প্রকাশ্যে পাওয়া এই তথ্য থেকে সম্মেলনের মোট বাজেট, প্রত্যেক পৃষ্ঠপোষকের অর্থের পরিমাণ এবং কোনো বিদেশি সরকার বা বিদেশি ফাউন্ডেশনের আর্থিক অবদান কত—তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন তৈরি হয়।
একটি আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক সম্মেলন যদি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, সমুদ্র নিরাপত্তা, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তাহলে তার অর্থায়নের কাঠামো জানা কি অযৌক্তিক?
বরং উল্টোটা—অর্থায়নের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হলে বোঝা সম্ভব হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কতটা অর্থ দিয়েছে এবং কোনো অর্থের সঙ্গে কোনো শর্ত বা এজেন্ডা নির্ধারণের প্রক্রিয়া যুক্ত ছিল কি না।
এখানে একটি প্রশ্ন অবশ্যই আছে, কিন্তু তার উত্তরও প্রকাশ্যে চাওয়া দরকার:
বিওবিসি ২০২৬-এর অর্থায়নের সঙ্গে সিজিএসের অন্যান্য বিদেশি অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পের কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক যোগসূত্র আছে কি না?
অর্থায়ন চুক্তিতে কি কোনো অধিবেশন বা আলোচনার বিষয় নির্ধারণের অধিকার ছিল? বক্তা নির্বাচনে পৃষ্ঠপোষকের কোনো ভূমিকা ছিল? সম্মেলন থেকে নীতিপত্র বা সুপারিশ তৈরি হলে তার সম্পাদনাগত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে এলে বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের আলোচ্যসূচি কী কী?
আয়োজকদের প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী বিওবিসি ২০২৬-এর পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হলো—
ক্ষমতার পরিবর্তন, প্রযুক্তির নতুন সীমান্ত, নতুন অর্থনৈতিক ভূগোল, জলবায়ু-সহনশীলতা ও মানবনিরাপত্তা এবং আস্থা-গণতন্ত্র-শাসনব্যবস্থা।
এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনীতি, কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার পরিসর, তথ্যের ক্ষমতা, বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, কৌশলগত প্রবৃদ্ধি, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং শাসনব্যবস্থা।
এগুলো এমন বিষয়, যেগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সরাসরি জড়িত।
আর এ কারণেই বাংলাদেশের জনগণের একটি প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক—
এই সম্মেলন কি শুধু মতবিনিময়ের জায়গা, নাকি এখান থেকে ভবিষ্যৎ নীতিগত সুপারিশ তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে?
সিজিএস বলছে, বিওবিসির লক্ষ্য তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণে অবদান রাখা এবং নতুন নীতিচিন্তাকে উৎসাহিত করা।
অর্থাৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব তৈরির সম্ভাবনাটি আয়োজকরাই অস্বীকার করছেন না; বরং সেটিই এই মঞ্চের একটি ঘোষিত উদ্দেশ্য।
তাহলে সম্মেলন শেষে কী সুপারিশ তৈরি হলো—সেটি জানার অধিকারও জনগণের থাকা উচিত।
গোপন বৈঠক ও জনস্বার্থের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু রুদ্ধদ্বার আলোচনা থাকা অস্বাভাবিক নয়।
