বাংলাদেশ ও চিলির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকে চিলি থেকে ক্রিটিক্যাল মিনারেল (Critical Minerals) আমদানি, একটি সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং দুই দেশের রাজধানীতে আবাসিক দূতাবাস স্থাপনের বিষয়ে নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং চিলির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সিসকো পেরেজ ম্যাকেনা দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে চিলি থেকে ক্রিটিক্যাল মিনারেল আমদানির সম্ভাবনা, বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, ওষুধ, বৈদ্যুতিক পণ্য ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময় এবং ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় হয়। পাশাপাশি ঢাকা ও সান্তিয়াগোতে প্রথমবারের মতো আবাসিক দূতাবাস স্থাপনের বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
তামা (Copper), লিথিয়াম (Lithium) এবং অন্যান্য ক্রিটিক্যাল মিনারেল বর্তমানে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। বৈদ্যুতিক যান (EV), ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, মিসাইল এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক্স শিল্পে এসব খনিজ অপরিহার্য।
বিশ্বব্যাপী এই খনিজগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দেখা দিলে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত বিকল্প সরবরাহ উৎস গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি চিলি থেকে নিয়মিত তামা, লিথিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আমদানি করে দেশে স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ এবং মিনারেল প্রসেসিং হাব গড়ে তুলতে পারে, তাহলে কয়েকটি বড় সুবিধা পাওয়া সম্ভব—
-
শিল্প খাতে কাঁচামালের নিরাপত্তা বৃদ্ধি।
-
বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
-
ইলেকট্রনিক্স, ব্যাটারি ও উচ্চ প্রযুক্তি উৎপাদন শিল্প বিকাশ।
-
আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি।
-
দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
চিলি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা উৎপাদনকারী দেশ এবং লিথিয়াম উৎপাদনেও শীর্ষস্থানীয়। ফলে বৈশ্বিক ক্রিটিক্যাল মিনারেল সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ ইতোমধ্যে চিলির সঙ্গে ক্রিটিক্যাল মিনারেল সহযোগিতা জোরদার করেছে।
বাংলাদেশ সরকার যদি সময়োপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্রিটিক্যাল মিনারেল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রসেসিং ও শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে আগামী দশকে দেশটি শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক অর্থনীতি হিসেবেই নয়, বরং উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
তবে উল্লেখযোগ্য যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে, নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা হবে বা জিডিপিতে নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রবৃদ্ধি যোগ হবে—এ ধরনের পরিসংখ্যান বর্তমানে সরকারি বা স্বাধীন কোনো গবেষণা দ্বারা নিশ্চিত নয়। এগুলো সম্ভাব্য বিশ্লেষণ বা পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
তথ্যসূত্র: BSS
