বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের শীর্ষস্থানীয় ১১টি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প, প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাতে মোট ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে এসব কোম্পানি, যা বাস্তবায়িত হলে এটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হবে।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
শনিবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ইতিবাচক বার্তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করনীতি (Tax Outlook) প্রকাশ করেছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ করনীতি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাচ্ছেন, যা নীতিগত স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
কোন খাতে কত বিনিয়োগের প্রস্তাব?
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) প্রকল্পে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া—
- ঝংসিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ পায়রা শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রকল্পে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়।
সাংহাই এসইউএস এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (Waste-to-Energy) প্রকল্পে প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
- চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (CCECC) মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্ডেড গুদাম এবং আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব উন্নয়নে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
এছাড়াও জ্বালানি, স্মার্ট মিটার উৎপাদন, সৌরবিদ্যুৎ, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, রেলওয়ে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষা, ওষুধ শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন খাতে শত শত মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, মোংলা বন্দর ও পায়রা শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
তবে এই বিনিয়োগগুলো এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা, প্রকল্প যাচাই, আর্থিক মূল্যায়ন, সরকারি অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
এসব প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে চীনের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ প্রবাহের পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিডা (BIDA)
