চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল (বিইজেড) দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এ অঞ্চলে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে এবং এখানকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ৫২.৮২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ হাজার ৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) জানিয়েছে, প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি জুতা, ড্রোন, ওষুধের কাঁচামাল (এপিআই), ব্যাটারি উপাদান ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে মিরসরাইয়ের এই অর্থনৈতিক অঞ্চল।
৬৩ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ চুক্তি
সম্প্রতি চীনের হুয়ারুন টেক্স কোম্পানি লিমিটেড বেপজার সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি একটি আধুনিক টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
বেপজার তথ্যমতে, এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৬৩টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তাদের মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১.৪৯ বিলিয়ন ডলার।
ইতোমধ্যে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে, আর তিনটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালাচ্ছে।
বিশাল রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে রয়েছে ৫৩৯টি শিল্প প্লট এবং দুটি বহুতল কারখানা ভবন। এর মধ্যে অধিকাংশ প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ৩৫-৪০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বেপজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এখানে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে। তখন অঞ্চলটি থেকে বছরে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব হবে এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
রপ্তানিতে শীর্ষে কাইজি লঞ্জারি
বর্তমানে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি ১৮.৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ইতোমধ্যে ৩৪.৫৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তাদের কারখানায় কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজার ৬৫১ জন বাংলাদেশি।
এছাড়া:
কেপিএসটি শুজ (বিডি) ৯.১ মিলিয়ন ডলারের ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি করেছে।
মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল ২.৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
ফেংকুন কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল ২.২১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ৩.০৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
চীনের নেতৃত্বে বিদেশি বিনিয়োগ
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীন। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে:
আলপেন বানিয়ান গার্মেন্টস বিডি – ১০৮.৯৯ মিলিয়ন ডলার
মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল – ৭৬.৪১ মিলিয়ন ডলার
কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ – ৬০.৮৫ মিলিয়ন ডলার
তাই মা শুজ (বিডি) – ৫৫.০৫ মিলিয়ন ডলার
দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক হ্যান্ডব্যাগ ৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া হংকং, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের আগমন
বেপজা জানিয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে উচ্চপ্রযুক্তি খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
চীনা প্রতিষ্ঠান অ্যারোসিন্থ লিমিটেড ৩.৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে বিনোদন, মাছ ধরা ও পণ্য পরিবহনের জন্য ড্রোন উৎপাদন করবে।
অন্যদিকে ক্রিসেন্ট হাই টেক কোম্পানি ৭.৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ওষুধ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন করবে, যা দেশের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রথমা পাওয়ার সাপ্লাই লিমিটেড ব্যাটারি প্লেট উৎপাদনে ১২.২৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
গ্যাস সংকটে বাধাগ্রস্ত শিল্প কার্যক্রম
বিনিয়োগ ও রপ্তানির অগ্রগতি সত্ত্বেও গ্যাস সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ১৫টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি কার্যক্রম চালালেও গ্যাস সংযোগ না থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন বলেন, “গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ আনা সম্ভব হতো।”
তিনি আরও জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে কাস্টমসের সব সেবা এখনও চালু না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্র
বিশ্লেষকদের মতে, মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বৃহৎ কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ ও প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করতে পারে।
