নীল নদের পানি বণ্টন ও ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধের পরিচালনা নিয়ে মিসর, ইথিওপিয়া ও সুদানের দীর্ঘদিনের বিরোধ এখনো আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নীল নদের প্রধান উপনদী নীলনদের ওপর নির্মিত এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ইথিওপিয়া তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, মিসর ও সুদান উজান থেকে পানির প্রবাহ, বাঁধ পরিচালনা এবং খরার সময় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধের নির্মাণ শুরু হয় ২০১১ সালে এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইথিওপিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটির উদ্বোধন করে। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ প্রকল্পটিকে আঞ্চলিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে মিসর ও সুদানের আশঙ্কা, বাঁধের জলাধার পূরণ ও পানি ছাড়ার ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকলে বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী খরার সময় ভাটির দেশগুলোর পানির নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিরোধের মূল জায়গা বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং এর পরিচালনা, পানির প্রবাহ, খরার সময়ে পানি ছাড়ার নিয়ম এবং তথ্য বিনিময় নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তির প্রশ্ন। মিসর দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি আইনি কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছে, যেখানে বাঁধ পরিচালনার নিয়ম, পানির প্রবাহ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় স্পষ্ট থাকবে। ইথিওপিয়া আবার নীল নদের পানিকে উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
এই বিরোধে সুদানের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে ইথিওপিয়া ও মিসরের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা সুদান বাঁধের পানি ব্যবস্থাপনা থেকে সম্ভাব্য সুবিধা পেতে পারে, আবার অতিরিক্ত পানি প্রবাহ বা বাঁধ পরিচালনার বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি থাকলে ঝুঁকির মুখেও পড়তে পারে। তাই খার্তুমের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়, পূর্বঘোষণা এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালেও নীলনদের পানি নিয়ে বিরোধটি বৃহত্তর হর্ন অব আফ্রিকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইথিওপিয়ার সঙ্গে মিসর ও সুদানের সম্পর্কের পাশাপাশি তিগ্রাই অঞ্চলের নতুন সংঘাত, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক অভিযোগ আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে এসব উত্তেজনার মধ্যেও নীলনদের পানি বিরোধের সমাধানের সবচেয়ে বাস্তব পথ হিসেবে কূটনৈতিক আলোচনা, তথ্য বিনিময়, খরা ব্যবস্থাপনা এবং বাঁধ পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতার বিষয়টিই সামনে রয়েছে।
