যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির আর্থিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্টের শেষে দেশটির মোট জাতীয় ঋণ প্রায় ৪০.০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে শুধু ঋণের পরিমাণ দেখেই যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মূল প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির আকারের তুলনায় ঋণ কত দ্রুত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে সেই ঋণের সুদ ও মূলধন পরিশোধের চাপ কতটা বাড়বে।
জাতীয় ঋণ বুঝতে হলে বাজেট ঘাটতি ও ঋণের পার্থক্য জানা জরুরি। কোনো বছরে সরকারের আয় যদি ব্যয়ের চেয়ে কম হয়, তাহলে যে ঘাটতি তৈরি হয় সেটিই বাজেট ঘাটতি। সেই ঘাটতি পূরণ করতে সরকার ধার নিলে তা আগের ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট জাতীয় ঋণ বাড়ায়। অর্থাৎ, ঘাটতি হলো নির্দিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান, আর জাতীয় ঋণ হলো বহু বছরের ঘাটতি থেকে জমে থাকা সরকারের মোট দায়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর, শুল্ক ও বিভিন্ন ফি থেকে বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ করলেও সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, সরকারি কর্মসূচি এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় তার চেয়ে বেশি। ২০২৬ অর্থবছরে মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট কার্যালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সরকারের আয় প্রায় ৫.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ব্যয় প্রায় ৭.৪ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে। ফলে ঘাটতি প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আগের ঋণের সুদ, যা সরকারের ব্যয়ের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।
এই বিপুল অর্থের প্রয়োজন মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের সরকারি ঋণপত্র বিক্রি করে। ব্যাংক, বিনিয়োগকারী, পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি সরকারসহ বিভিন্ন পক্ষ এসব ঋণপত্র কিনে সরকারকে অর্থ দেয়। বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময় পর মূল অর্থ এবং সুদ ফেরত দেওয়ার দায় নেয় মার্কিন সরকার। তাই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার বলতে সরকারের হাতে থাকা নগদ অর্থ বোঝায় না; এটি বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ধার থেকে তৈরি হওয়া বিশাল দায়ের পরিমাণ।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কোনো একটি কারণ দায়ী নয়। কয়েক দশক ধরে আয় ও ব্যয়ের কাঠামোগত ব্যবধান, বিভিন্ন সময়ে কর ও সরকারি ব্যয়ের সিদ্ধান্ত, মহামারিকালে বিপুল সরকারি সহায়তা এবং দীর্ঘদিনের সামরিক ও অন্যান্য ব্যয় মিলেই ঋণকে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সুবিধা হলো, মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান মজুত মুদ্রা এবং মার্কিন সরকারি ঋণপত্রকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র অন্য অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলক সহজে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু এই সুবিধা সীমাহীন নয়। ঋণ যদি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়বে এবং সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদ অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের জন্যও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন সরকারি ঋণপত্র আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতির পরিবর্তন বৈশ্বিক সুদের হার, বিনিয়োগ, মুদ্রাবাজার ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ নিজে কোনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের প্রমাণ নয়; বরং এর দ্রুত বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
