আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আফগানিস্তানজুড়ে রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বড় উদ্যোগ নিয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া। এর অংশ হিসেবে দেশের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে মোট ১,৫৩৭ কিলোমিটার রেলপথের জরিপ ও নকশা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। সরকারের লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদে আফগানিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবহন ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করা।
আফগানিস্তানের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট রুটগুলোর সম্ভাব্যতা, ভূমি এবং অবকাঠামোগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রয়োজনীয় জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ আশরাফ হকশেনাস জানান, বর্তমানে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে কাজ চলছে। এগুলো হলো—তোরঘুন্দি–হেরাত, হেরাত–কান্দাহার, কান্দাহার–স্পিন বোলদাক, কাবুল–কান্দাহার এবং আন্দখোয়–শেবেরঘান।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব রেলপথ বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক সংযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলপথ ব্যবহার করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে পণ্য সরবরাহ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও আরও গতিশীল হতে পারে।
আফগান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এসব প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের রেল যোগাযোগ শক্তিশালী করা, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করা। এর পাশাপাশি আফগানিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ রেলপথকে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় কাবুল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হাসিবুল্লাহ মোহিবজাদার মতে, কার্যকর রেল অবকাঠামো গড়ে উঠলে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রেল যোগাযোগ শক্তিশালী করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানও এই উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। দেশটি মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ সফল হলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে পণ্য পরিবহনে আফগানিস্তানের ভূমিকা বাড়তে পারে। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়ার বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে উঠে আসতে পারে।
বিশেষ করে হেরাত, কান্দাহার, কাবুল এবং উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ শক্তিশালী হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সীমান্তবাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে ১,৫৩৭ কিলোমিটার রেলপথের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে জরিপ, নকশা, ভূমি, অবকাঠামো এবং অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে প্রকল্পগুলোর জরিপ ও নকশা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। তাই পূর্ণাঙ্গ রেল নেটওয়ার্ক চালু হতে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে, আফগানিস্তানের এই উদ্যোগ দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৫টি রুটে ১,৫৩৭ কিলোমিটার রেলপথের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, রপ্তানি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই অবকাঠামো আফগানিস্তানকে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত করার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
