তেল শোধন শিল্পে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে চীনা বিজ্ঞানীদের নতুন একটি গবেষণা। প্রচলিত উচ্চতাপমাত্রার পাতন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অণু-স্তরের পৃথকীকরণে মেমব্রেন প্রযুক্তি ব্যবহার করে হালকা ন্যাফথার বিভিন্ন উপাদান আলাদা করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন তারা। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পরীক্ষিত ব্যবস্থায় প্রচলিত পাতন প্রক্রিয়ার তুলনায় শক্তি খরচ প্রায় ৯১ শতাংশ কমতে পারে। তবে এই হিসাব পুরো অপরিশোধিত তেল শোধনের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
চীনের ডালিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল ফিজিক্স ও সহযোগী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন। গবেষণাটি ১২ আগস্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাশনাল সায়েন্স রিভিউয়ে ‘মলিকিউলার-লেভেল পেট্রোলিয়াম রিফাইনিং বাই গ্রেডেড মেমব্রেনস’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। গবেষণার লক্ষ্য ছিল, তেল শোধনে প্রচলিত তাপভিত্তিক পৃথকীকরণের পরিবর্তে কম শক্তিনির্ভর একটি বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করা।
প্রচলিত শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল ও তার বিভিন্ন অংশকে আলাদা করতে উচ্চ তাপ প্রয়োগ করে পাতন করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। নতুন পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা ধাতু-জৈব কাঠামোভিত্তিক মেমব্রেন ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে কিউবিটিসি নামের মেমব্রেনের ছিদ্রের আকার ও পৃষ্ঠের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ট্যানিক অ্যাসিডের মৃদু অতি-সূক্ষ্ম ক্ষয় পদ্ধতির মাধ্যমে মেমব্রেনের বৈশিষ্ট্য ধাপে ধাপে পরিবর্তন করে দুই ধরনের মেমব্রেনকে ধারাবাহিক পৃথকীকরণ ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়।
প্রথম ধাপে অণুর আকারের সামান্য পার্থক্য কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন আলাদা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য ব্যবহার করে আরও সূক্ষ্ম পৃথকীকরণ করা হয়। গবেষকদের মতে, কিছু উপাদানের আকারের পার্থক্য মাত্র ০.০১ থেকে ০.০৩ ন্যানোমিটার হলেও সেগুলো আলাদা করা সম্ভব হয়েছে।
প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করা হয় ১৫টি উপাদান নিয়ে তৈরি সি৫–সি৭ হালকা ন্যাফথার একটি কৃত্রিম মিশ্রণের ওপর। পরীক্ষায় মিশ্রণটিকে তিন ধরনের উচ্চমূল্যের প্রবাহে ভাগ করা সম্ভব হয়—ইথিলিন উৎপাদনের কাঁচামাল, রাসায়নিক শিল্পের মধ্যবর্তী উপাদান এবং গ্যাসোলিন তৈরির উপযোগী উপাদান। এসব প্রবাহের পুনরুদ্ধারের হার ছিল প্রায় ৮৫–৯০ শতাংশ। একই পরীক্ষায় পুরো পৃথকীকরণ ব্যবস্থায় শক্তি খরচ প্রায় ৯১ শতাংশ কমার হিসাব পাওয়া যায়।
তবে গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, এটি সম্পূর্ণ অপরিশোধিত তেল শোধনাগারে পরীক্ষা করা হয়নি। পরীক্ষাটি হালকা ন্যাফথার নির্দিষ্ট একটি কৃত্রিম মিশ্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই ৯১ শতাংশ শক্তি সাশ্রয়ের দাবিকে বিশ্বের সব শোধনাগারের জন্য প্রযোজ্য ফল হিসেবে দেখা যাবে না। তবু শিল্প পর্যায়ে প্রযুক্তিটি কার্যকর, দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তব শোধনাগারের কাঁচামালে একই ফল দিতে পারলে তেল শোধন শিল্পে কম শক্তিনির্ভর অণুভিত্তিক পৃথকীকরণের নতুন পথ খুলতে পারে। উচ্চতাপীয় পাতন বৈশ্বিকভাবে বিপুল শক্তি ব্যবহার করে এবং বড় পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এমন প্রযুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্বও যথেষ্ট।
