যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াকে কোনো পক্ষ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে চলমান উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর কোরিয়াবিষয়ক নীতিকে দায়ী করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বৃহস্পতিবার সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সঙ-লাকের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ওয়াং ই দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশটির উচিত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বা জোটের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত না হয়ে উভয় দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। বেইজিংয়ের এই অবস্থান মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে চীনের উদ্বেগকেই সামনে এনেছে।
বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। ওয়াং ইয়ের দাবি, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘বৈরী’ নীতি পরিবর্তন করা হলে উপদ্বীপের উত্তেজনা কমানো সহজ হবে। একই সঙ্গে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে পুনরায় সংলাপ শুরু এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। চীন দুই কোরিয়ার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখতে চায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ওয়াং ইয়ের এই আহ্বানের সময়ই কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেখা যায়। জাপানের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে একটি সন্দেহভাজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের যৌথ সামরিক মহড়ার সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে সংলাপের আহ্বানের পাশাপাশি সামরিক কার্যক্রমও কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি চীন-দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন ওয়াং ই। তিনি দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগও বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নভেম্বরে শেনঝেনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বেইজিং।
সব মিলিয়ে, ওয়াং ইয়ের সিউল সফরে নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখার চীনা কৌশল স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে বেইজিং কোরীয় উপদ্বীপে সংলাপ ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দক্ষিণ কোরিয়াকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে সিউলের সামনে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
