গাজার শিশুদের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী ট্রমা কীভাবে একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করছে !
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিজের ঘর হারানো, স্বজন হারানো, বারবার বাস্তুচ্যুতি—গাজার শিশুদের কাছে শৈশব এখন আর নিরাপদ সময়ের নাম নয়। যুদ্ধের সরাসরি আঘাত থেমে গেলেও এর মানসিক ক্ষত থেকে যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও ক্ষতি একটি প্রজন্মের আচরণ, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজায় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকারদের একটি হলো শিশুরা। তাদের অনেকের শৈশব কেটেছে বোমাবর্ষণ, বাস্তুচ্যুতি, স্বজন হারানো, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও তাদের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব সহজে শেষ হওয়ার নয়।
ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত শিশু-কেন্দ্রিক মূল্যায়নে গাজার শিশুদের মধ্যে ব্যাপক মানসিক ও সামাজিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। অভিভাবকদের ৪০ শতাংশ শিশুদের ঘুমের সমস্যার কথা জানিয়েছেন, ৩২ শতাংশের ক্ষেত্রে বিছানায় প্রস্রাব করার মতো আচরণগত পরিবর্তন এবং ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা গেছে। ১৫ শতাংশ শিশু নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অভিভাবকেরা। এসব লক্ষণের ৯২ শতাংশই ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একটি শিশু যে বয়সে নিরাপত্তা, পরিবার, স্কুল ও খেলাধুলার মাধ্যমে পৃথিবীকে চিনতে শেখে, সেই বয়সেই গাজার বহু শিশু শিখেছে—হঠাৎ বিস্ফোরণ হতে পারে, বাড়ি ছেড়ে পালাতে হতে পারে, প্রিয় মানুষটি আর ফিরে নাও আসতে পারে।
যুদ্ধ শেষ হলেও ভয় থেকে যায়
শিশুর মানসিক ট্রমা শুধু একটি ভয়ংকর ঘটনা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের ভয় বারবার ফিরে এলে সেটি শিশুর নিরাপত্তাবোধকে বদলে দিতে পারে। গাজায় সেই পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতা ছিল দীর্ঘস্থায়ী।
ইউনিসেফের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও গাজার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবরের পরও ২৭৭ শিশু নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং ইউনিসেফের সঙ্গে পরামর্শ করা শিশুদের প্রায় ১০ জনের ৯ জনই মানসিক ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো—শিশুরা শুধু যুদ্ধ দেখেনি, তারা যুদ্ধের কারণে নিজেদের ভবিষ্যতের স্বাভাবিক কাঠামোটিও হারিয়েছে। স্কুল, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, বাড়ি—শিশুর স্বাভাবিক জীবনের প্রায় প্রতিটি জায়গাই কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধের অভিঘাতে আক্রান্ত হয়েছে।
স্কুলে ফিরলেও কি শৈশব ফিরে আসে?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাজার কয়েক লাখ শিশু প্রায় তিন বছর পর আবার সরাসরি শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে। কিন্তু সেই স্কুল আগের স্কুল নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইউনিসেফের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তাই স্কুলে ফিরে যাওয়া নিঃসন্দেহে আশার একটি চিহ্ন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া তিন বছর শুধু বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় দিয়ে পূরণ করা যায় না। শিক্ষা হারানোর অর্থ শুধু পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়া নয়। শিশুর চিন্তাশক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, নিয়মিত জীবনযাপন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও স্কুলব্যবস্থার ভাঙনের ফলে গাজার শিশুদের শেখা, স্মৃতিশক্তি, পড়াশোনার অভ্যাস এবং সামাজিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক শিশুর শৈশব এখন শেখার পরিবর্তে বেঁচে থাকার চারপাশে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
শরীরের ক্ষত, মনের ক্ষত
গাজার শিশুদের একটি অংশ শুধু মানসিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও যুদ্ধের স্থায়ী ক্ষত বহন করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় আহত প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৪৩ হাজার মানুষ জীবন পরিবর্তনকারী আঘাত পেয়েছেন। তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু। ৫ হাজারের বেশি অঙ্গচ্ছেদের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
একজন শিশুর একটি হাত বা পা হারানো মানে শুধু একটি অঙ্গ হারানো নয়। এর সঙ্গে বদলে যায় তার চলাফেরা, পড়াশোনা, খেলাধুলা, আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা। তাই গাজার পুনর্গঠন শুধু রাস্তা ও ভবন পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়। একটি প্রজন্মের শরীর ও মন—দুটোকেই পুনর্গঠন করতে হবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—ট্রমা প্রজন্মান্তরে যেতে পারে
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গাজার ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২৫০ জন কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই অন্তত তিনটি যুদ্ধ-সম্পর্কিত আঘাতমূলক ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বেশি মাত্রায় যুদ্ধজনিত ট্রমার সঙ্গে PTSD, complex PTSD, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপের বেশি লক্ষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এখানেই “একটি নতুন প্রজন্ম” কথাটির গুরুত্ব।
