৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০০৩ সালের ২০ মার্চ শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণকে আজ আর শুধু একটি যুদ্ধ হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক-সামরিক প্রকল্প—যার প্রথম পর্যায়ে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত, পরবর্তী পর্যায়ে দখল ও পুনর্গঠন, এরপর ২০১৪ সাল থেকে ISIS-বিরোধী যুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সমাপ্তি।আজ, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটল। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—২৪ বছর ধরে চলা এই অভিযানের অর্জন কী, আর এর মূল্য কত?
প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়
Iraq Body Count (IBC)-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী ২০০৩ সালের পর সহিংসতায় প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজারের কাছাকাছি বেসামরিক মৃত্যুর বিস্তৃত রেকর্ড রয়েছে—যদিও তাদের বর্তমান ডাটাবেসে পরিসর ও শ্রেণিবিন্যাস আলাদা করে দেখানো হয়। IBC-এর বর্তমান public record-এ নথিভুক্ত বেসামরিক সহিংস মৃত্যুর সংখ্যা ২০০,০৬৫–২২৬,৬২৮, আর বেসামরিক ও combatant মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ।
অন্যদিকে Brown University-এর Costs of War প্রকল্প ২০০৩–২০২৩ সময়ের জন্য ইরাক যুদ্ধের সরাসরি মৃত্যুর পরিমাণ ২৮০,৭৭১–৩১৫,১৯০ হিসেবে হিসাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
মার্কিন সামরিক: ৪,৫৯৯
মার্কিন contractor: ৩,৬৫০
ইরাকি সামরিক ও পুলিশ: ৪৮,৩৩৭–৫২,৩৩৭
বেসামরিক: ১৮৬,৬৯৪–২১০,০৩৮
বিরোধী যোদ্ধা: ৩৬,৮০৬–৪৩,৮৮১
অন্যান্য মিত্র, সাংবাদিক ও মানবিক কর্মীসহ অন্যান্য মৃত্যু। তবে এগুলো মূলত direct deaths।যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়া, নিরাপদ পানি ও খাদ্যের সংকট, বাস্তুচ্যুতি, রোগ, অবকাঠামো ধ্বংস ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে যে indirect deaths হয়েছে, সেগুলো নির্ভুলভাবে গণনা করা কঠিন।তাই “ইরাক যুদ্ধে মোট কত মানুষ মারা গেছে”—এর উত্তর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়; বরং নথিভুক্ত সরাসরি মৃত্যুর চেয়ে প্রকৃত মানবিক ক্ষতি বেশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ইরাকের অর্থনৈতিক ক্ষতি
World Bank-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংঘাতের কারণে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইরাকের non-oil GDP-তে cumulative real loss প্রায় ১২৪ ট্রিলিয়ন ইরাকি দিনার বা প্রায় ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছিল—যদি যুদ্ধের আগে অর্থনীতি যে হারে বাড়ছিল সেই ধারার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর বাইরে রয়েছে—
বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতি
পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা
হাসপাতাল ও স্কুলসড়ক ও সেতু
তেল ও শিল্প
অবকাঠামো ব্যবসা ও
কর্মসংস্থান
বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন
যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যয়
বিশেষ করে ISIS-এর দখলে থাকা পাঁচটি গভর্নরেটে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। UNDP বলছে পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও জীবিকার ওপর বড় আঘাত এসেছিল।
আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যয়
Brown University-এর Costs of War প্রকল্প ২০০৩–২০২৩ সময়ের ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হিসাব করেছে প্রায় ১.৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার।এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে—
সরাসরি Pentagon war spending
Pentagon-এর অতিরিক্ত base-budget ব্যয়
State Department ব্যয়
যুদ্ধের জন্য ধার করা অর্থের সুদযুদ্ধ-সম্পর্কিত
veterans' medical/disability care
ভবিষ্যৎ veteran care যুক্ত করলে
২০৫০ সাল পর্যন্ত হিসাবটি প্রায় ২.৮৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক সহায়তার আরও প্রায় ১৭৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। [৬]তবে মনে রাখতে হবে—এটি ইরাক একা নয়; ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মিলিত হিসাব।২০২৬ সালে যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যয় ও সামরিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকায় ২০২৩ সালের এই হিসাবকে আজকের চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
সাদ্দাম হোসেনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র কোথায়?
ইরাক আক্রমণের প্রধান যুক্তিগুলোর একটি ছিল সাদ্দাম সরকারের কাছে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত থাকার দাবি।কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী Iraq Survey Group তদন্তে ২০০৩ সালের শুরুতে ইরাকে সক্রিয় WMD stockpile থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। CIA-র প্রকাশিত নথিতেও এই তদন্তের এমন ফলাফল উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রকাশ্য যুক্তির সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রাখা জরুরি: ইরাকের অতীতে রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ইতিহাস ছিল; কিন্তু ২০০৩ সালে যে সক্রিয় মজুত থাকার দাবি করা হয়েছিল, তদন্তে তার সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
Abu Ghraib: যুদ্ধের সবচেয়ে কুখ্যাত অধ্যায়
