অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও স্থাপনা নজরদারি এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ইসরায়েল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আল-জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের তৈরি ‘ইমিসাইট’ নামের প্রযুক্তি স্যাটেলাইট ও আকাশচিত্র বিশ্লেষণ করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূমির পরিবর্তন ও নতুন স্থাপনা শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পরিবর্তন সম্ভাব্য অননুমোদিত নির্মাণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ধ্বংস অভিযান পরিচালনার পথ সহজ হতে পারে। আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি প্রথমে নেগেভ মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইন ফিলিস্তিনিদের এলাকায় ভূমি পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে একই ধরনের প্রযুক্তি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ব্যবহারের তথ্য সামনে এসেছে।
২০২৫ সালে পশ্চিম তীরে ভূমি আইন প্রয়োগের জন্য ইসরায়েলি ভূমি কর্তৃপক্ষের একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়। ইসরায়েলি অধিকার সংগঠন পিস নাউয়ের মতে, ওই ইউনিট ভূমিতে অননুমোদিত পরিবর্তন শনাক্ত করতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও গবেষকদের আশঙ্কা, বিশাল এলাকা দ্রুত পর্যবেক্ষণ এবং বিপুল পরিমাণ ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা থাকায় কোনো স্থাপনাকে অননুমোদিত হিসেবে শনাক্ত করা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় দ্রুত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য তথ্য বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য স্থাপনা শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ায়। তবে অধিকারকর্মীরা সতর্ক করেছেন, অ্যালগরিদমনির্ভর শনাক্তকরণে ভুল হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জবাবদিহি ও প্রতিকার পাওয়ার বিষয়টি জটিল হতে পারে।
পশ্চিম তীরে স্থাপনা ধ্বংসের ব্যাপকতাও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে স্পষ্ট। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত এরিয়া সি-তে প্রায় ৭০০ এবং পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৭০টি ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন স্থাপনা ইসরায়েলি নির্মাণ অনুমোদন না থাকার কারণে ধ্বংস করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এসব এলাকায় মাসিক স্থাপনা ধ্বংসের গড় আগের ১৫ বছরের গড়ের অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে। আগস্টের ১১ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যেও পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ৭৯টি ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘ, যার ফলে ১৬টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা অব্যাহত ছিল।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২ থেকে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাসাফের ইয়াত্তার কয়েকটি এলাকায় ৪৯টি স্থাপনা ধ্বংস করা হয় এবং ৫৭ জন বাস্তুচ্যুত হন। ফলে পশ্চিম তীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কটি শুধু নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে নয়; ভূমি নজরদারি, নির্মাণ অনুমোদন, স্থাপনা ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের জবাবদিহি—সবকিছুকে ঘিরেই তা বিস্তৃত হচ্ছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ভূমি ব্যবস্থাপনার তথ্য মিলিয়ে বিষয়টি এখন প্রযুক্তি, ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকারের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হিসেবে সামনে এসেছে।
