ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
স্মোট্রিচের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করছে। একই সময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি রেকর্ড ১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যার ৩৬ শতাংশ গেছে ইউরোপের বাজারে এবং ১৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে।
ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইসরায়েলের নতুন সুযোগ
জিওপলিটিক্স প্রাইমের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে ইউরোপের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে ইউরোপের দেশগুলো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সরবরাহকারী ও অংশীদার খুঁজছে।
এই পরিবর্তনকে ইসরায়েলের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখছেন স্মোট্রিচ। তার লক্ষ্য হলো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিরক্ষা অবকাঠামোয় ইসরায়েলি অস্ত্র ও প্রযুক্তির উপস্থিতি আরও বাড়ানো।
সাম্প্রতিক সময়েও ইউরোপে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গ্লোবস জানিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উৎপাদন, অবকাঠামো এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে।
‘গ্যারান্টর’ হিসেবে ইসরায়েলকে দেখার পরিকল্পনা
জিওপলিটিক্স প্রাইমের প্রতিবেদনে স্মোট্রিচের বক্তব্যকে এমন একটি কৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি দেশগুলোর নিরাপত্তা অবকাঠামোর সঙ্গে ইসরায়েলি প্রযুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত করা হবে।
বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও নজরদারি প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে কোনো দেশের নির্ভরতা যদি নির্দিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর তৈরি হয়, তাহলে সেই সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কও গড়ে উঠতে পারে—এমন যুক্তি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট প্রতিরক্ষা রপ্তানির ২৯ শতাংশ ছিল ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিও মোট রপ্তানির ১১ শতাংশ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে ইসরায়েল?
জিওপলিটিক্স প্রাইমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা সম্পর্কের কাঠামোয় পরিবর্তন এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ইসরায়েলকে নতুন সুযোগ দিতে পারে।
তবে ইসরায়েলকে ইউরোপের নিরাপত্তার ‘গ্যারান্টর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখনো একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য বা ধারণা—এটি ইউরোপীয় দেশগুলোর গৃহীত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। ইসরায়েল নিজেও ঐতিহাসিকভাবে তার নিরাপত্তার প্রধান বহিরাগত নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকেই বিবেচনা করে এসেছে।
প্রতিরক্ষা রপ্তানি ইসরায়েলের কৌশলগত হাতিয়ার
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইউরোপ ছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা পণ্যের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বাজার, মোট রপ্তানির ৩৬ শতাংশ নিয়ে।
ফলে স্মোট্রিচের বক্তব্যকে শুধু অস্ত্র বিক্রির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে নয়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পকে দেশটির বৈদেশিক সম্পর্ক ও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহারের বৃহত্তর ধারণার সঙ্গেও দেখা হচ্ছে।
সূত্র: জিওপলিটিক্স প্রাইম
