গ্রিসের জন্য একটি বহুতল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইসরাইলের সঙ্গে প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) দুই দেশের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। চুক্তির মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। ইসরাইলের সঙ্গে গ্রিসের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে পরিচিত এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের হুমকি মোকাবিলা করা। পরিকল্পিত ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করবে। এর আওতায় ডেভিডস স্লিং, স্পাইডার এবং বারাক এমএক্সসহ বিভিন্ন ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে গ্রিসের আকাশসীমা সুরক্ষায় একাধিক ধরনের হুমকিকে একই কাঠামোর মধ্যে মোকাবিলা করার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। গ্রিস বর্তমানে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের আধুনিকায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভিত্তিক হুমকি বাড়তে থাকায় বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই চুক্তির পাশাপাশি গ্রিসকে ড্রোন প্রতিরোধে ব্যবহৃত ‘ড্রোন ডোম’ ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য পৃথক একটি চুক্তিও হয়েছে। এর মূল্য প্রায় ২৬ মিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ মূল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে ছোট আকারের ড্রোন মোকাবিলার জন্যও গ্রিসকে আলাদা সক্ষমতা দেওয়া হবে। এর ফলে গ্রিসের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় আকাশ থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলার সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হবে। অর্থাৎ গ্রিস শুধু ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করবে না, বরং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও শিল্পভিত্তিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে গ্রিসের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিক থেকেও চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তি দুই দেশের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও জোরদার করবে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে গ্রিস ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
গ্রিসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো আধুনিক সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা। বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে চুক্তির সাফল্য শুধু সরঞ্জাম সরবরাহের ওপর নয়, বরং সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার ও পরিচালনা করা যায়, তার ওপরও নির্ভর করবে।
ইসরাইলের জন্যও এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। একটি বড় আকারের প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে গ্রিসের মতো একটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসরাইলের কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, গ্রিসের সঙ্গে প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর এই চুক্তি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একটি বড় অগ্রগতি। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন মোকাবিলায় গ্রিসের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ২৬ মিলিয়ন ইউরোর ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা চুক্তিটিকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফলে এটি শুধু অস্ত্র কেনার উদ্যোগ নয়; বরং গ্রিসের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকায়ন এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরাইল-গ্রিস কৌশলগত সহযোগিতার আরও গভীর ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
