কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করে ইসরাইলের পক্ষে অনুকূল তথ্য ও বয়ান ছড়িয়ে দিতে একটি ভুয়া মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক তথাকথিত স্বাধীন ওয়েবসাইটের নেটওয়ার্কে অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অভিযোগের মূল বিষয় হলো, প্রচলিত প্রচারপদ্ধতির বাইরে গিয়ে এমন বিপুল পরিমাণ অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে মানুষের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার তথ্যভান্ডারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর আইনগত অস্তিত্ব, নির্দিষ্ট কার্যালয়, কর্মী কিংবা প্রকাশিত প্রতিবেদনের লেখকদের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ মাত্র ৬ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির নামে ১২৪টি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যার মোট শব্দসংখ্যা ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। এসব প্রতিবেদনের অনেক শিরোনাম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন সেগুলো সরাসরি কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটে করা সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর।
প্রতিবেদনগুলোতে নকবা, জায়নবাদবিরোধিতা, ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং গাজায় গণহত্যার অভিযোগসহ ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বিতর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত নথিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ হলো, এসব উপাদান এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা দুর্বল করা এবং গাজা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্য ও প্রমাণের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করা যায়।
এই প্রচারকৌশলের বিশেষ দিক হলো, এর লক্ষ্য শুধু সাধারণ পাঠক নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাও। গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, হ্যানোভার ওয়েবসাইটটি ‘রেস’ নামের একটি প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি এমন কনটেন্ট তৈরির কথা প্রচার করে, যা চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি, ক্লড ও জেমিনির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার উত্তরে সূত্র হিসেবে উঠে আসতে পারে। হ্যানোভারের সঙ্গে যুক্ত নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘পাইরো ইনক’ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য তথ্য উপযোগী করে সাজানোর সেবা বাজারজাত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, পাইরো ইসরাইলি সরকারের পক্ষে কাজ করার বিষয়টি মার্কিন বিদেশি এজেন্ট নিবন্ধন আইনের অধীনে নিবন্ধন করেছে বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই অনুসন্ধানে ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’-এর সঙ্গে ইসরাইলি সরকারের ৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের চুক্তির কথাও উঠে এসেছে। এই চুক্তির আওতায় গাজা নিয়ে ইসরাইলি অবস্থান সমর্থনকারী কনটেন্ট ছড়াতে ১০টি ওয়েবসাইট তৈরি এবং শত শত নিবন্ধ প্রকাশের দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের প্রচেষ্টার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট ও নিবন্ধে একই ধরনের বয়ান ছড়িয়ে দেওয়া হলে তা উন্মুক্ত ইন্টারনেটের তথ্যভান্ডারে স্থায়ীভাবে যুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণের সময় এসব তথ্য ব্যবহৃত হলে নির্দিষ্ট বয়ান মডেলের জ্ঞানভান্ডারের অংশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এর সঙ্গে ইসরাইলের তথ্যযুদ্ধ নিয়ে দেশটির সাবেক সরকারি যোগাযোগ কর্মকর্তা এলি হাজানের মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি বর্তমান তথ্যযুদ্ধে সত্যের গুরুত্ব কমে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য মোকাবিলায় ভুয়া তথ্য তৈরির কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু শুধু রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যসূত্র ও ভবিষ্যৎ জ্ঞানভান্ডারকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনাও। তবে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উত্থাপিত প্রতিটি দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, উৎস যাচাই এবং জনমত গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন সামনে আনছে।
