অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে হামলা চালিয়ে সেখানে প্রবেশ করেছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবারের ওই ঘটনায় বাড়ির মালিক লুয়াই আদলিসহ কয়েকজন সেখানে অবস্থান করছিলেন। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত হামলায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেয়নি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
লুয়াই আদলি সিএনএনকে জানান, শনিবার দুপুরের দিকে কয়েকজন বসতি স্থাপনকারী তাঁর বাড়ির দিকে পাথর ছুড়তে শুরু করেন। তিনি ইসরাইলি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর হামলাকারীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে বলে তাঁর দাবি। একপর্যায়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন বসতি স্থাপনকারী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে চারদিক থেকে বাড়িটিতে পাথর ছোড়া হয়।
পরে ইসরাইলি সেনারা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও শুরুতে হামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন আদলি। তিনি আরও জানান, পরে বাড়ির দিকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হলে ভেতরে থাকা লোকজন শ্বাসকষ্টের কারণে ছাদে উঠে যেতে বাধ্য হন। এরপর ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে আটক করে চোখ বেঁধে ফেলে এবং নিজের বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করে বলে দাবি করেন তিনি।
সিএনএনের হাতে থাকা ভিডিওতে একদল ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীকে বাড়িটির এক পাশ থেকে পাথর ছুড়তে দেখা গেছে। অন্য পাশে ইসরাইলি সেনাদের অবস্থানও দেখা যায়। তবে ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভিডিওটি এককভাবে সম্পূর্ণ তথ্য দেয় না।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বাড়িটির ভেতরে কয়েক ডজন ‘দাঙ্গাকারী’ অবস্থান করছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন উপায়ে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। তবে হামলাকারীরা কীভাবে গ্রেপ্তার ছাড়াই ঘটনাস্থল ত্যাগ করল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, অভিযানে ব্যবহৃত ৩টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। যদিও রোববার পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ঘটনাটিকে দেশটির আইন ও মূল্যবোধের প্রতি ‘সরাসরি ও প্রকাশ্য অবজ্ঞা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ইসরাইলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নেতানিয়াহুও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে ঘটনাগুলোকে ‘আইন লঙ্ঘনকারী মুষ্টিমেয় দাঙ্গাকারীর’ কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তদন্ত দ্রুত শেষ করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
কুসরা গ্রামে গত কয়েক মাস ধরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও চাপ বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এর আগে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ভয় দেখানো ও হয়রানির উদ্দেশ্যে সংঘটিত ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
একই দিনে পশ্চিম তীরের জালুদ শহরে ফিলিস্তিনি এক নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় এনবিসি নিউজের একটি দলের ওপরও মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। প্রতিবেদক ম্যাট ব্র্যাডলির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা গাড়ি থেকে নেমে লাঠি দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর আঘাত করে। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হয়।
ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিক ও ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর এ ধরনের হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বারবার ঘটে চলা সহিংসতার ধারাবাহিকতা। নাবলুস এলাকার ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী আয়েদ জাফরিও কুসরা, জালুদসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার আশঙ্কা প্রায় প্রতিদিনই থাকার অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, কুসরা ও জালুদ এলাকায় অতিরিক্ত তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং নতুন সহিংসতা ঠেকাতে কাজ চলছে। তাদের ভাষ্য, সব ধরনের সহিংসতারই তারা নিন্দা জানায়। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান এয়াল জামিরও পশ্চিম তীরে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। এই অঞ্চলে ৭ লাখের বেশি ইসরাইলি বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ মনে করে।
সব মিলিয়ে, কুসরা ও জালুদে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ হামলার নিন্দা ও তদন্তের কথা বললেও ঘটনাগুলোর পর দ্রুত গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বেগ রয়ে গেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে স্থানীয় নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
