ইয়েমেনে নতুন করে কোনো স্থল অভিযান চালালে সৌদি আরবের জন্য তা ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত হবে বলে সতর্ক করেছেন হুথি-নিয়ন্ত্রিত সানা সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবেদ আল-থাওর। তার এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব—এমন খবর প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
আল-থাওর দাবি করেছেন, ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথি বাহিনী তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। একইসঙ্গে সৌদি আরবকে ইয়েমেনে স্থল অভিযান শুরু না করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।
তাইজ দখলকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে হুথিরা
আল-থাওর তাইজ প্রদেশের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, পুরো তাইজের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে গেলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ভেঙে পড়বে।
তাইজ বর্তমানে ইয়েমেনের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। সাম্প্রতিক সময়ে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর মধ্যে সেখানে তীব্র লড়াই হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ২ অক্টোবর তাইজ প্রদেশে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে হুথি অবস্থান, যোদ্ধা, যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে ২০টি বিমান হামলা চালানোর দাবি করেছে।
এর আগে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী তাইজের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমি দখলের দাবিও করেছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এসব দাবি স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি বাহিনীর জন্য নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সীমিত অভিযান অথবা তাইজ, আল-বায়দা, মারিব ও আল-জাওফসহ একাধিক ফ্রন্টে সমন্বিত আক্রমণের বিকল্প রয়েছে। সম্ভাব্য অভিযানে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধাকে ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে নতুন অভিযান সৌদি আরবের জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। হুথিদের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এটি রিয়াদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
‘সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এখন বাস্তবতা’
আল-থাওর সৌদি ভূখণ্ডে হামলার বিষয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার দাবি, ইয়েমেনের বাইরে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা এখন হুথিদের হাতে রয়েছে এবং এটি আর কেবল হুমকি নয়, বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বরেও আল-থাওর এএফপিকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে সামরিকভাবে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থকে হুথিরা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু তাইজ ও বাব আল-মান্দাব
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগ বেড়েছে। রিয়াদ মনে করছে, বাব আল-মান্দাবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে তাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
ফলে তাইজের যুদ্ধ শুধু একটি প্রাদেশিক সংঘাত নয়; এর সঙ্গে বাব আল-মান্দাব, লোহিত সাগরের নৌপথ এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা—সবকিছুই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
হুথি উপদেষ্টার ‘আত্মঘাতী’ সতর্কবার্তার বিপরীতে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত কতটা বড় সামরিক অভিযান চালাবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে সাম্প্রতিক সামরিক প্রস্তুতি ও তাইজে তীব্র লড়াই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাত আবারও বড় আকারের সামরিক উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট অবজারভার
