ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে ‘শরীয়াহ আদালত’ রয়েছে এবং দেশটি ইসলামিক রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে গেছে—এমন অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে আক্রমণ করে তিনি ব্রিটিশ রাজধানীতে শরীয়াহ আইন ও মুসলিম প্রভাব বাড়ার দাবি তুলেছেন। ২০২৬ সালের ৩ মার্চ জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের সময় লন্ডন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, সেখানে শরীয়াহ আদালত রয়েছে এবং এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়। একই বক্তব্যে তিনি সাদিক খানকে ‘অযোগ্য’ বলেও সমালোচনা করেন।
লন্ডন ও ব্রিটেনের আইনব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের এমন মন্তব্য অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি ব্রিটেনের কিছু এলাকায় শরীয়াহ আইন চর্চার দিকে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। এসব মন্তব্য ব্রিটিশ রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অর্থাৎ লন্ডনে ‘শরীয়াহ আদালত’ থাকার দাবি নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন।
যুক্তরাজ্যে কিছু শরীয়াহ কাউন্সিল রয়েছে, যারা মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ দেয়। বিশেষ করে ইসলামি বিবাহ, বিচ্ছেদ এবং কিছু পারিবারিক বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় নির্দেশনা বা পরামর্শ দিয়ে থাকে। কিন্তু এগুলো ব্রিটিশ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বিচারিক আদালত নয়। তাদের সিদ্ধান্তও ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় আদালতের রায়ের মতো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে শরীয়াহ কাউন্সিলের অস্তিত্বকে ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা শরীয়াহ আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে—এমন অর্থে দেখা যায় না।
ট্রাম্পের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খান ট্রাম্পের লন্ডনবিষয়ক বক্তব্যকে ‘ভুল তথ্য ও মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পাশাপাশি ব্রিটিশ কূটনীতিকদের এসব দাবি মোকাবিলায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
বিষয়টির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনের অভিবাসননীতি, মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং লন্ডনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন। সাদিক খান মুসলিম হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সমালোচনাও বহুদিনের। ফলে লন্ডনের শরীয়াহ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শুধু আইনব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য হিসেবে নয়, বরং ব্রিটেনের অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় এবং নগর রাজনীতিকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যে শরীয়াহ কাউন্সিলের অস্তিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় শরীয়াহ আদালত—দুটি বিষয় এক নয়। ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বেসরকারি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি থাকলেও ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা ব্রিটিশ আইন ও আদালতের কাঠামোর অধীনেই পরিচালিত হয়। তাই ট্রাম্পের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তীব্র হলেও ‘ব্রিটেন একটি ইসলামিক কান্ট্রি হয়ে গেছে’—এই দাবিকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে না। বিষয়টি মূলত রাজনীতি, অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় এবং তথ্যভিত্তিক জনআলোচনার মধ্যকার বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
