সামুদ্রিক জলসীমায় নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় তুরস্ক আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ‘নীল মাতৃভূমি’ নীতি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইস্তাম্বুলে আয়োজিত একটি মহাকাশ ও প্রযুক্তি উৎসব পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, তুরস্কের সামুদ্রিক অধিকার রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না এবং দেশের জলসীমায় তুরস্কের অধিকার ‘এক বিন্দুও ছাড় না দিয়ে’ রক্ষা করা হবে।
‘নীল মাতৃভূমি’ তুরস্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও সামুদ্রিক কৌশল। এর মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর, এজিয়ান সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের সামুদ্রিক অধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামুদ্রিক সীমা নির্ধারণ, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং দ্বীপগুলোর চারপাশের জলসীমা নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে গ্রিস ও সাইপ্রাসের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ফলে ‘নীল মাতৃভূমি’ এখন শুধু প্রতিরক্ষা নীতি নয়; তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
এজিয়ান সাগরে তুরস্ক ও গ্রিসের বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র হলো দ্বীপগুলোর সামুদ্রিক অধিকার। তুরস্কের অবস্থান, এজিয়ান সাগরের ছোট ছোট দ্বীপকে কেন্দ্র করে গ্রিসের অতিরিক্ত সামুদ্রিক অধিকার দাবি তুরস্কের মূল ভূখণ্ডের স্বার্থকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে গ্রিস আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী তার দ্বীপগুলোর সামুদ্রিক অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে। এই মতপার্থক্যের সঙ্গে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ যুক্ত হওয়ায় বিরোধটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত কয়েক বছরে তুরস্ক নৌবাহিনী ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দেশটি যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন, সাবমেরিনসহ বিভিন্ন নৌ-সামরিক সরঞ্জাম নিজস্বভাবে তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে তুরস্ক স্থলভিত্তিক সামরিক শক্তির পাশাপাশি সমুদ্র ও আকাশপথেও নিজস্ব কৌশলগত সক্ষমতা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পের এই সমন্বয় ‘নীল মাতৃভূমি’ নীতিকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গুরুত্ব শুধু তুরস্ক, গ্রিস ও সাইপ্রাসের বিরোধের কারণে নয়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই অঞ্চল জ্বালানি সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে যেকোনো সামুদ্রিক দাবি বা সামরিক তৎপরতা বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রিস, সাইপ্রাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তুরস্কের কিছু সামুদ্রিক দাবি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আঙ্কারা সামুদ্রিক জলসীমা ও সম্পদের প্রশ্নে তার অবস্থান আরও দৃঢ় রাখতে প্রস্তুত। তুরস্কের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু সামুদ্রিক সীমারেখা নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি যুক্ত। ফলে কৃষ্ণসাগর থেকে এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত তুরস্কের সামুদ্রিক তৎপরতা আগামী দিনেও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
রেফারেন্স: হুরিয়েত ডেইলি নিউজ
