তুরস্ক নিজস্ব নকশা ও প্রযুক্তিতে নির্মাণাধীন প্রথম জাতীয় বিমানবাহী রণতরি ‘মুগেম’কে ২০২৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সমুদ্রে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তুর্কি নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এরজুমেন্ট তাতলিওগ্লুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোকায়েলির গলচুক নৌঘাঁটিতে নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। মুগেম শুধু প্রচলিত বিমান পরিচালনার জন্য নয়; মানববিহীন আকাশযান, মানববিহীন পৃষ্ঠযান এবং মানববিহীন পানির নিচের যান সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্যও নকশা করা হচ্ছে।
মুগেমের সবচেয়ে আলোচিত সক্ষমতা হলো এর বড় আকারের মানববিহীন যুদ্ধবিমান বহনের পরিকল্পনা। তুর্কি নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এতে সর্বোচ্চ ৫২টি কিজিলেলমা মানববিহীন যুদ্ধবিমান বহনের সক্ষমতা রাখা হবে। পাশাপাশি আনকা-৩, বায়রাকতার টিবি-৩ এবং নৌ সংস্করণের হুরজেট ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে মুগেমকে প্রচলিত বিমানবাহী রণতরির পরিবর্তে বিমান ও মানববিহীন যুদ্ধব্যবস্থার সমন্বিত একটি বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তুরস্ক।
জাহাজটির আকারও উল্লেখযোগ্য। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৫ মিটার, সর্বোচ্চ প্রস্থ ৭২ মিটার এবং ড্রাফট ১০ দশমিক ১ মিটার। ডিসপ্লেসমেন্ট প্রায় ৬০ হাজার টন। সর্বোচ্চ গতি ২৬ নটের বেশি এবং ১৪ নট গতিতে প্রায় ১০ হাজার নটিক্যাল মাইল চলার সক্ষমতা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকবে।
মুগেমে স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও বাধাযুক্ত অবতরণ পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সামনের দিকে ঢালু উড্ডয়ন র্যাম্পের মাধ্যমে বিমান ওড়ানো হবে এবং অবতরণের সময় বিশেষ বাধা ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়া হবে। এই নকশা মুগেমকে প্রচলিত বিশাল বিমানবাহী রণতরি থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেবে।
আকারের দিক থেকে মুগেম তুরস্কের বর্তমান টিসিজি আনাদোলুর তুলনায় বড় এবং ফ্রান্সের শার্ল দ্য গল বিমানবাহী রণতরির চেয়েও দীর্ঘ। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জেরাল্ড আর. ফোর্ড শ্রেণির সমতুল্য নয়। মুগেমের মূল বৈশিষ্ট্য বড় আকারের পাশাপাশি ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতা।
এই প্রকল্প তুরস্কের ‘নীল মাতৃভূমি’ নীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশটি নিজস্ব ফ্রিগেট, করভেট, সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন নৌযানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। মুগেমের মাধ্যমে তুরস্ক বিমানবাহী রণতরি নির্মাণে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। প্রকল্পে দেশীয় উপাদানের ব্যবহার ৮০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ২০২৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সমুদ্রে নামানো মানেই মুগেম সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষম হয়ে যাবে না। সমুদ্রে নামানোর পর বিভিন্ন পরীক্ষা, ব্যবস্থা সমন্বয় এবং বিমান ও মানববিহীন যান পরিচালনার সক্ষমতা যাচাইয়ের ধাপ থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩২ সালে এটি সরবরাহ ও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে প্রবেশ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, মুগেম তুরস্কের জন্য শুধু একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ নয়; এটি বিমানবাহী রণতরি নির্মাণ, ড্রোন যুদ্ধ এবং আকাশ, সমুদ্র ও পানির নিচে মানববিহীন ব্যবস্থাকে একই প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত করার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। পরিকল্পিত সক্ষমতাগুলো বাস্তবে সফল হলে তুরস্কের নৌশক্তি ও আঞ্চলিক সামুদ্রিক কৌশলে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে।
