অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী আপার সুবানসিরি জেলায় চীনা বাহিনীর তৎপরতা এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টে ভারতীয় সেনাদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী তকসিংসহ দুর্গম এলাকায় চীনা বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশীদার পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন করে এসব অভিযোগ সামনে আনে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, তকসিং এলাকায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহল কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানী দলের সদস্য জেরাংয়ের দাবি, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি টহল পয়েন্ট থেকে সরে যায়। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঐতিহ্যগত শিকারক্ষেত্রেও প্রবেশের সুযোগ কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।
স্থানীয় নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সীমান্ত এলাকায় চীনা অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় যতটা সম্ভব ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগকে ভুল ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অভিযোগ এবং ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সীমান্ত পরিস্থিতির প্রভাব বৃহত্তর ভারত-চীন সম্পর্কেও পড়তে পারে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্ত ইস্যুতে দুই দেশ কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করছে।
ভারত ও চীনের প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বড় অংশ নিয়েই বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। চীন অরুণাচলকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ হিসেবে দাবি করে, অন্যদিকে ভারত অঞ্চলটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। এই বিরোধের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ডোকলামে দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থা এবং ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়। গালওয়ানের ঘটনায় ২০ ভারতীয় ও ৪ চীনা সেনা নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে সীমান্ত বিরোধ সত্ত্বেও দুই দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত-চীন পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ১৫১.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে চীনের বড় বাণিজ্য ঘাটতিও রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও গুরুত্ব পাচ্ছে। এমন সময়ে অরুণাচল সীমান্তে নতুন অভিযোগ সামনে আসায় স্পষ্ট হচ্ছে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের মৌলিক সমাধান এখনো হয়নি। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সীমান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে।
