বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণা, দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং নীল অর্থনীতির উন্নয়নে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম মহাসাগর উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য উদ্ভাবন কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে। ২০২৬ সালের ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা এই কেন্দ্র দেশের সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতদিন বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, ঢেউয়ের উচ্চতা, ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উপগ্রহ তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগত এবং উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হতো। নতুন কেন্দ্র চালুর ফলে এই দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে মাত্র ১০–১৫ মিনিটের মধ্যেই সর্বশেষ সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১১টি আন্তর্জাতিক পৃথিবী ও মহাসাগর পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ থেকে সরাসরি তথ্য গ্রহণ করা যাবে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, মেঘের গতিবিধি, ঢেউয়ের উচ্চতা, লবণাক্ততা এবং সামুদ্রিক আবহাওয়ার পরিবর্তন দ্রুত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সক্ষমতা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, জেলে ও নৌযান পরিচালনায় আগাম সতর্কতা আরও কার্যকর করবে।
প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে চীনের দ্বিতীয় মহাসাগর গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ কোটি টাকার প্রযুক্তিগত ও যন্ত্রপাতিগত সহায়তা প্রদান করেছে। এর ফলে বিদেশি তথ্যসেবা ক্রয়ের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং দেশের নিজস্ব গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অবৈধ মাছ ধরা, সন্দেহজনক নৌযান শনাক্তকরণ, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণেও নতুন সক্ষমতা তৈরি হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মাছ ধরার অঞ্চল নির্ধারণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণা, উপকূলীয় পরিকল্পনা এবং জ্বালানি অনুসন্ধানেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, “এসজিএসএমআরএস ২০৩৫ মহাপরিকল্পনা” বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে কক্সবাজারে দ্বিতীয় তথ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
