ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজায় প্রতিদিন রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। রোববার (১৬ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পডকাস্টে গাজা থেকে মুক্তি পাওয়া এক সাবেক ইসরায়েলি বন্দির সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে গাজায় চলমান যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পডকাস্টে বেন-গভির গাজার বাসিন্দাদের একটি অংশকে ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, যারা ইসরায়েলের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করছে না। তাঁর এই বক্তব্য যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক জনগণের সুরক্ষার মধ্যকার সীমারেখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বর্তমান যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতিতেও গাজায় বিমান হামলা কমানোর বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের সমালোচনা করেন বেন-গভির। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সামরিক অভিযান আরও কঠোর করার পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের ফাঁসি কার্যকরের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এসব বক্তব্য গাজা পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং অতি-ডানপন্থী চাপের বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।
এর পাশাপাশি বেন-গভির গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর ও স্থায়ীভাবে বসতি পরিবর্তনের মতো পরিকল্পনাকে জাতিগত নিধনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফলে তাঁর বক্তব্য শুধু সামরিক অভিযানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গাজার ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই তথ্যের প্রেক্ষাপটে বেন-গভিরের প্রকাশ্য বক্তব্য বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
ইতামার বেন-গভির চরমপন্থী কাহানিজম আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে গাজা নিয়ে তাঁর সর্বশেষ মন্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে দেখার পাশাপাশি ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান এবং যুদ্ধনীতি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, গাজায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান, বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার সমর্থন, বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রতিশ্রুতি এবং ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে বসতি স্থাপনের আহ্বান—বেন-গভিরের বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুতর রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এমন বক্তব্য গাজার ভবিষ্যৎ শান্তি, বেসামরিক সুরক্ষা এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
