দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত অ্যান্টিলোপ রিফে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের প্রথম ধাপ শেষ করেছে চীন। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা উপগ্রহচিত্রে প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ভূমি এবং সেখানে বিভিন্ন অবকাঠামোর উপস্থিতি দেখা গেছে। অন্তত ৬ মাস ধরে মাটি ভরাট ও নির্মাণকাজ চলার পর বেশিরভাগ ড্রেজার ও অন্যান্য নির্মাণযন্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্মিত এলাকায় একটি গভীর পানির বন্দর এবং প্রায় ৬৮০ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি রয়েছে। উপগ্রহচিত্রে জেটির পাশে চীনের একটি কোস্টগার্ড জাহাজও দেখা গেছে। এসব অবকাঠামো থেকে বোঝা যায়, অঞ্চলটিতে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ও কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।
নতুন কৃত্রিম দ্বীপের এক পাশে ৩ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি সরল উপকূলীয় অংশও তৈরি হয়েছে। কয়েকজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ধারণা, এই অংশটি ভবিষ্যতে রানওয়ে নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করা হতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্রের সাম্প্রতিক এক গবেষণাতেও সেখানে সম্ভাব্য রানওয়ের প্রাথমিক খননকাজ শুরু হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে হেলিকপ্টার অবতরণস্থলসহ আরও কিছু স্থাপনা নির্মাণের প্রমাণ উপগ্রহচিত্রে পাওয়া গেছে।
তবে চীন অ্যান্টিলোপ রিফে নতুন কোনো সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের কথা স্বীকার করেনি। বেইজিংয়ের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অন্যান্য বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। ফলে স্থাপনাগুলোর ঘোষিত ব্যবহার এবং সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্ন মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অবকাঠামো দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তরাঞ্চলে চীনের নজরদারি ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে সম্ভাব্য তাইওয়ান সংঘাতের পরিস্থিতিতে অ্যান্টিলোপ রিফের ভৌগোলিক অবস্থান চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে সেখানে দীর্ঘপাল্লার নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক বিমান কিংবা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এগুলো এখন পর্যন্ত বিশ্লেষকদের সম্ভাব্য মূল্যায়ন, চীনের ঘোষিত পরিকল্পনা নয়।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন কোহের মতে, ভবিষ্যতে এই স্থাপনা চীনের পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনের জন্য সুরক্ষিত সমুদ্রাঞ্চল তৈরির প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাও এখনো নিশ্চিত সামরিক পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত নয়।
অ্যান্টিলোপ রিফ প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের অংশ। চীন ১৯৭৪ সাল থেকে পুরো প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে ভিয়েতনামসহ অন্যান্য পক্ষ এই অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে। ভিয়েতনাম এর আগে অ্যান্টিলোপ রিফে চীনের নির্মাণকাজের বিরোধিতা করেছে।
ফলে নতুন কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ চীন সাগরের দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সামরিক ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত। নির্মাণকাজের পরবর্তী ধাপে রানওয়ে, নজরদারি ব্যবস্থা বা অন্যান্য স্থাপনা কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপর অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো, চীন সেখানে বড় আকারের ভূমি ভরাট ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে; এসব স্থাপনার চূড়ান্ত ব্যবহার সম্পর্কে বেইজিংয়ের সরকারি অবস্থান এখনো বেসামরিক কার্যক্রমকেন্দ্রিক।
