বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে চীনের প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বিশ্বের ১৫১টি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে চীন। অর্থাৎ প্রায় ৭৩ শতাংশ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিমাণ বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পণ্যভিত্তিক অংশীদার দেশ অনুযায়ী বাণিজ্য তথ্য ব্যবহার করে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫১ দেশের সঙ্গে চীনের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৪.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি বাণিজ্য করা ৫৭টি দেশের সঙ্গে তাদের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০০০ সালে মাত্র ৩৩টি দেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন বড় বাণিজ্য অংশীদার ছিল। দুই দশকের বেশি সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৫১-তে পৌঁছানো চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
চীনের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান এশিয়ায়। ২০২৫ সালে হংকংয়ের সঙ্গে চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ৩৬৯.২ বিলিয়ন ডলার, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ৩৩১.৭ বিলিয়ন, জাপানের সঙ্গে ৩২২.৫ বিলিয়ন, তাইওয়ানের সঙ্গে ৩১৪.৪ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে ২৯৬.৬ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিও চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ভারতের সঙ্গে ২০২৫ সালে চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৫৫.৭ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২৪.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্প, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও উৎপাদন খাতে চীনের বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থার উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
চীনের নিজস্ব বাণিজ্য সম্প্রসারণও এই পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের মোট পণ্য আমদানি-রপ্তানির মূল্য ছিল ৪৫.৪৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা আগের বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বেশি এবং ডলারের হিসাবে প্রায় ৬.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ২৪০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ২৩.৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫১.৯ শতাংশ। একই সময়ে চীন-আসিয়ান বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ৭.৫৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে।
এই পরিবর্তনের পেছনে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান বাজারে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ বাজারে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ২০২৫ সালের বাণিজ্যচিত্র দেখাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ক্রমেই আরও বহুমুখী হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনে চীন একটি প্রধান শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করছে।
