এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, যোগাযোগ ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আব্দুলহামিদের উদ্যোগে নির্মিত এই রেলপথ পুনরায় চালুর লক্ষ্যে চলতি বছরের ৯ জুন তুরস্ক ও সৌদি আরব একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। এর আগে এপ্রিল মাসে তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্দান পরিবহন সহযোগিতা জোরদারে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে পৌঁছায়। এসব উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সংযোগ কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হেজাজ রেলপথের ইতিহাস উনিশ শতকের শেষভাগে শুরু হয়। ১৯০০ সালের ২ মে দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করা হয় এবং ১৯০৮ সালে মূল রেলপথের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে এর বিস্তৃতি প্রায় ১,৭৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। ঐতিহাসিকভাবে এই রেলপথ শুধু পরিবহন ব্যবস্থার অংশ ছিল না; এটি অঞ্চলভিত্তিক সংযোগ, অর্থনৈতিক বিনিময় এবং মুসলিম বিশ্বের ভৌগোলিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো।
তুর্কি ইতিহাসবিদ উফুক গুলসয়ের মতে, হেজাজ রেলপথ পুনরুজ্জীবন কেবল অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি বহু মানুষের কাছে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতীক। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন পরিবেশ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে এই রেলপথ বিকল্প স্থলপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহন, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই ধরনের বৃহৎ সংযোগ প্রকল্প কার্যকর করতে নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও বহু রাষ্ট্রের সমন্বিত নীতিগত সহযোগিতা অপরিহার্য হবে।
একই সঙ্গে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, হেজাজ রেলপথ পুনরায় চালু হওয়া এবং উন্নয়নভিত্তিক আঞ্চলিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংযোগ পরিকল্পনাগুলোর বিকল্প বা প্রতিযোগী কাঠামোতেও রূপ নিতে পারে। ফলে এই উদ্যোগ শুধু রেল যোগাযোগ নয়, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ও তৈরি করতে পারে।
