নীল নদের পানি প্রবাহ একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইথিওপিয়াকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে মিশর। ইথিওপিয়ার পানিসম্পদ ও জ্বালানি মন্ত্রী হাবতামু ইটেফারের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর কায়রো স্পষ্ট করেছে, নীল নদের পানির ওপর কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তারা মেনে নেবে না। মিশরের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং নীল নদের উজান ও ভাটির দেশগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইথিওপিয়ার পক্ষ থেকে নীল নদের ওপর আরও বাঁধ নির্মাণ এবং মিশর ও সুদানের দিকে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মিশরের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, এটি ইথিওপিয়ার দীর্ঘদিনের একতরফা নীতির ধারাবাহিকতা। কায়রোর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে নীল নদের প্রধান উপনদী ব্লু নাইলে নির্মিত গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম এবং ভবিষ্যতে আরও ৩টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা।
মিশরের কর্মকর্তারা মনে করেন, নীল নদ একটি আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় এর পানি ব্যবস্থাপনায় উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। বিশেষ করে বাঁধ পরিচালনা, পানি ধারণ ও পানি ছাড়ার বিষয়ে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। মিশর দীর্ঘদিন ধরে ইথিওপিয়ার কাছে এমন একটি চুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে, যাতে খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতেও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না থাকে।
মিশরের জন্য বিষয়টি শুধু পরিবেশ বা পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দেশটি বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক রাষ্ট্র এবং তার পানির প্রধান উৎস নীল নদ। মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি নীল নদের পানিকে দেশের জন্য ‘অস্তিত্বগত’ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উজানের দেশ হিসেবে ইথিওপিয়া নীল নদের পানি নিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কায়রোর আশঙ্কা, ইথিওপিয়া যদি পানি ধারণ ও ছাড়ার বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে মিশর ও সুদানের পানির প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা না থাকলে ভাটির দেশগুলোর কৃষি, পানি সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে বলে মিশর মনে করে।
অন্যদিকে, ইথিওপিয়া নীল নদের পানি ব্যবহারকে নিজেদের উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৈধ অধিকার হিসেবে দেখে। গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যামকে দেশটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে বিরোধের মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—উজানের উন্নয়ন অধিকার এবং ভাটির পানির নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
মিশর জানিয়েছে, নীল নদের ওপর নতুন কোনো একতরফা পদক্ষেপ তারা মেনে নেবে না এবং নিজেদের পানির অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ফলে নীল নদের পানি নিয়ে দীর্ঘদিনের মিশর–ইথিওপিয়া বিরোধ আবারও উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সমাধানের জন্য একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে বাধ্যতামূলক চুক্তি, নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং উজান–ভাটির দেশগুলোর সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
