বেইজিং, ১২ জুলাই: রসায়নে নোবেলজয়ী খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ড. ওমর ইয়াঘি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের দীর্ঘদিনের অধ্যাপনা ছেড়ে চীনে যোগ দিচ্ছেন। তিনি বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন, যেখানে নতুন প্রজন্মের উপকরণ ও পদার্থ আবিষ্কারে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বিশ্ববিজ্ঞানের শক্তির ভারসাম্যে চলমান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা খাতে বাজেট ও নীতিগত অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে চীন বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করার কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ওমর ইয়াঘিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রসায়নবিদ হিসেবে অভিহিত করে। নতুন দায়িত্ব সম্পর্কে ইয়াঘি বলেন, এটি অতীতের কাজের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং আরও বড় পরিসরে, অধিক শক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
উদ্বাস্তু শিবির থেকে নোবেল পুরস্কার
ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে জন্ম নেওয়া ওমর ইয়াঘির জীবনসংগ্রাম বিজ্ঞান জগতের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। জর্ডানের আম্মানে শৈশব কাটানো ইয়াঘির পরিবারে বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সুবিধাও ছিল সীমিত। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রসায়নবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
গত বছর নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি অভিবাসীদের অবদান এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে বৈচিত্র্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তার মতে, বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা মেধাবীরা শুধু একটি দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
যুগান্তকারী আবিষ্কারের নায়ক
ওমর ইয়াঘি বিশেষভাবে পরিচিত ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ (MOFs) নামের এক নতুন ধরনের ছিদ্রযুক্ত উপাদান আবিষ্কারের জন্য। এই উপকরণগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে গ্যাস ও বাষ্প শোষণ, সংরক্ষণ এবং নির্গমন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, MOFs প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্বন ধারণ, জ্বালানি সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইতোমধ্যে ইয়াঘির গবেষণা দল মরুভূমির বাতাস থেকে পানযোগ্য পানি সংগ্রহের সফল পরীক্ষাও পরিচালনা করেছে।
এআই ও উপকরণ বিজ্ঞানের নতুন যুগ
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়াঘির নেতৃত্বাধীন নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নতুন উপাদান ও রাসায়নিক কাঠামোর নকশা তৈরি করবে। গবেষকদের আশা, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত গবেষণার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমর ইয়াঘির মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর চীনে যোগদান শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার পরিবর্তন নয়; বরং এটি বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও প্রতিফলন।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
