তালেবানের বক্তব্যে আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন রাজনৈতিক বয়ান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে একই সঙ্গে তাদের অবস্থানে বাস্তববাদী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। ২০২২ সালে সিরাজউদ্দিন হাক্কানি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তখন শত্রু হিসেবে দেখছে না এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও আত্মরক্ষার অধিকারকে বৈধ অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে ২০২১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তালেবান বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক বয়ানে আফগানিস্তান এমন একটি উদাহরণ, যেখানে দীর্ঘ সামরিক সংঘাতের পর বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহার করে এবং তালেবান ক্ষমতা গ্রহণ করে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনকে তুলে ধরা হচ্ছে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে, যেখানে স্বাধীনতার প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
এই তুলনা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আবেগগতভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ গাজায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের একটি খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষণ নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের শেষ নাগাদ গাজার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে, যদিও আগের তুলনায় কিছু মানবিক সূচকে উন্নতি হয়েছিল। ফলে ফিলিস্তিনের প্রশ্নকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক আবেদন আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তালেবানের এই অবস্থানকে মূলত ৩টি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, আদর্শিক স্তরে তারা নিজেদের দীর্ঘ সামরিক সংঘাতকে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করে। একই কাঠামোর মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিকে স্থান দেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৃহত্তর মুসলিম জনমতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক স্তরে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সক্রিয় অবস্থান তালেবানকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে চাপের মধ্যে থাকা তালেবানের জন্য এমন অবস্থান নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, ভূরাজনৈতিক স্তরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির স্মৃতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের প্রশ্নকে একই রাজনৈতিক বয়ানে যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনার জন্য তালেবানের হাতে একটি শক্তিশালী বক্তব্য তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে তালেবানের অবস্থান শুধু ধর্মীয় সংহতির প্রকাশ নয়; এর মধ্যে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, কূটনীতি ও ভূরাজনীতিকে একত্র করার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টাও দেখা যায়। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতাকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে যুক্ত করে তালেবান নিজেদের অবস্থানকে বৃহত্তর মুসলিম রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সূত্র: ইমারাহ নিউজ
