ওয়াশিংটন | উন্নত চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে মার্কিন বাজারে OpenAI ও Anthropic-এর মতো দেশীয় এআই প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Axios-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ওপেন-সোর্স এআই মডেল সীমিত করার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি চীনের নতুন এআই মডেল Kimi-এর দ্রুত উত্থানের পর সেই আলোচনা আবারও গতি পেয়েছে।
কেন উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান এখন চীনের ওপেন-সোর্স এআই মডেল ব্যবহার করছে, কারণ সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া যায় এবং কার্যক্ষমতার দিক থেকেও মার্কিন প্রযুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কী কী পদক্ষেপ বিবেচনায় ছিল?
Axios-এর সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা অতীতে কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনা করেছিল, যার মধ্যে রয়েছে—
চীনের একাধিক এআই গবেষণাগারকে Commerce Department-এর "Entity List"-এ অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে বিশেষ অনুমতি ছাড়া মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারে।
ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (NSA) এবং হোয়াইট হাউস অফিস অব দ্য ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টর থেকে চীনা এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জারি করা।
একটি সম্ভাব্য নির্বাহী আদেশ (Executive Order), যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে কেবল তখনই চীনা এআই মডেল হোস্ট করার অনুমতি দেওয়া হতো, যদি তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং সম্ভাব্য সাইবার হামলার দায়ভার গ্রহণ করে।
দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষার ক্ষমতা ব্যবহার করে চীনের ওপেন-সোর্স এআই মডেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের খসড়া নীতিমালা।
তবে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে দেননি।
পরিস্থিতি বদলাচ্ছে
Axios জানিয়েছে, প্রশাসনের ভেতরে জনবল পরিবর্তন এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রভাব বৃদ্ধির কারণে এখন আবারও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
যদিও হোয়াইট হাউস ও মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নাও আসতে পারে
সূত্রগুলোর মতে, প্রশাসন হয়তো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। পরিবর্তে সরকারি ক্রয়নীতি, Entity List-এর হুমকি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে জনমত তৈরির মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে চীনা এআই মডেল ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত করা হতে পারে।
এছাড়া চীনা মডেলে সম্ভাব্য "ব্যাকডোর", তথ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডেটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগও সামনে আনা হতে পারে।
প্রতিযোগিতা নাকি একচেটিয়া বাজার?
এই উদ্যোগ নিয়ে প্রযুক্তি খাতের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এমন নীতির ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে OpenAI ও Anthropic-এর মতো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলো আরও শক্তিশালী অবস্থান পাবে।
হোয়াইট হাউসের বাইরের এআই উপদেষ্টা ডেভিড স্যাকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ লিখেছেন,
"এআই নীতির ক্ষেত্রে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আয়ের দিক থেকে ইতোমধ্যে বাজারে প্রায় দ্বৈত আধিপত্য (duopoly) গড়ে তোলা শীর্ষ ক্লোজড-সোর্স এআই কোম্পানিগুলো এখন সরকারের মাধ্যমে তাদের ওপেন-সোর্স প্রতিযোগীদের সরিয়ে দিতে চায়।"
তিনি আরও বলেন, "তারা এখন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সিলিকন ভ্যালির বাকি অংশেরও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে।"
বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু বাণিজ্যিক নয়, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ট্রাম্প প্রশাসন চীনা এআই মডেলের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করে, তবে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাকেই নয়, বৈশ্বিক ওপেন-সোর্স এআই ইকোসিস্টেমকেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সূত্র: Axios
