ভারতে অবস্থানরত চাকমা নেতাদের একাংশ বাংলাদেশে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাকে তারা ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করে তা সংশোধনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সোমবার (১৭ আগস্ট) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়।
চাকমা নেতাদের এই বক্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিতের সিদ্ধান্ত। বিবৃতিতে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ভারত সফরে না যাওয়ার যে অবস্থান তারেক রহমান নিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা পুনর্বিবেচনা করা।
বিবৃতিতে বিশেষভাবে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় ভারত বাংলাদেশকে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। চাকমা নেতারা দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার পরও ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে ভারত বাংলাদেশকে ৩০ হাজার টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করেছে। তাঁদের মতে, ভারতের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করে এই সরবরাহ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধের দাবিও জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ওই সময়ে কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে প্রায় ২২৫ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। চাকমা নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের জন্য নিজেদের জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবে বিবৃতিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। চাকমা নেতারা দাবি করেছেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা অন্যায্য ছিল। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল এবং স্থানীয় আদিবাসী সমাজ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী ছিল। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
এই দাবির ভিত্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি করেছেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন চাকমা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের সদস্য ও বিধায়ক রসিক মোহন চাকমা, হিউম্যানিটি প্রোটেকশন ফোরামের সভাপতি গৌতম চাকমা, অরুণাচল প্রদেশের চাকমা হাজং এলডার্স ফোরামের প্রীতিময় চাকমা এবং চাকমা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সুহাস চাকমা।
সব মিলিয়ে, এই বিবৃতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, প্রত্যর্পণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রশ্নকে একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে এগুলো চাকমা নেতাদের একাংশের দাবি ও রাজনৈতিক অবস্থান; ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ নেই।
