মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩ লাখের বেশি মানুষকে রাখাইনে ফেরত নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে শনাক্ত হওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। ফলে ঘোষণাটি প্রত্যাবাসন আলোচনায় সম্ভাব্য অগ্রগতি তৈরি করলেও বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য পরীক্ষা করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করেছে মিয়ানমার। জান্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে শনাক্ত হওয়া এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
তবে যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও অনেকের তথ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ৪ হাজার ২৪১ জনকে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছে দেশটি। এসব দাবি নিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে কী ধরনের যাচাই ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল সূত্র ২০১৭ সালের আগস্টে। ওই সময় রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সে সময় হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ নথিভুক্ত করে। মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য ওই অভিযানের পেছনে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় নিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অবস্থান রয়েছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে ফেরত নেওয়ার সম্ভাবনার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তব মূল্যায়ন নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নাগরিকত্ব, বসবাসের অধিকার এবং প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে গেছে এবং উত্তর রাখাইনে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব রয়েছে। দুই দেশের পরিসংখ্যানের এই পার্থক্যও প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার ঘোষণা সম্ভাবনার দরজা খুললেও, রাখাইনের চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর প্রত্যাবাসনের পথ এখনো কঠিন ও অনিশ্চিত।
