আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের বরাতে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল অবকাঠামো ও সমুদ্রবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মস্কো যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্তে অনড় হয়েছে। তাদের মতে, আগামী মাসগুলোতে রাশিয়ার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
এই অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি চুক্তি এখন নাগালের মধ্যেই রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প পৃথকভাবে পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করলেও, ক্রেমলিন বর্তমান যুদ্ধরেখা ধরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী নয়।
ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, পুতিন তার উপদেষ্টাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের পুরো ডনবাস অঞ্চল দখল না করা পর্যন্ত কোনো আপস হবে না। তিনি এটিকে রাশিয়ার অপরিবর্তনীয় লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রকাশ্যে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও, প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
রুশ হামলা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাশিয়া নতুন সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিয়েভের কর্মকর্তাদের দাবি, মস্কো শুধু ইউক্রেনেই নয়, ভবিষ্যতে ইউরোপের আরও কিছু অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ সামরিক কৌশলবিদরা বাল্টিক অঞ্চলের ন্যাটো অবকাঠামো এবং রোমানিয়ায় সীমিত হামলার সম্ভাবনাও নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর লক্ষ্য হবে ন্যাটোর ঐক্যে ফাটল ধরানো, তবে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নয়।
পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পুতিনের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও পূরণ করতে পারে। এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (ড্রাফট) চালুর যৌক্তিকতা তৈরি করা সম্ভব হবে, যা রাশিয়ায় অত্যন্ত অজনপ্রিয় একটি পদক্ষেপ।
দেশের ভেতরে চাপ বাড়ছে
এদিকে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে ইউক্রেনে ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পুতিনের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর জবাবে রাশিয়া রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, পুতিন সামরিক কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন যে সীমান্তবর্তী হামলা ঠেকাতে ডনবাসের বাইরেও একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা বাফার জোন গড়ে তুলতে হবে।
ডনেস্কে চলছে রক্তক্ষয়ী লড়াই
প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যুদ্ধরেখাজুড়ে বর্তমানে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রুশ বাহিনীর সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্বকে অনেকাংশে নিরস্ত করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ধীর হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র লড়াই হচ্ছে ডনেস্ক অঞ্চলের কস্তিয়ানতিনিভকা শহরকে কেন্দ্র করে।
৩ জুলাই শহরটি দখলের দাবি করেছিল রাশিয়া। তবে ইউক্রেন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, ডনেস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন পুতিনের ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের মানবিক মূল্য বাড়ছেই
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ সেনা নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
এর মধ্যে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের বিপুল অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য সত্ত্বেও পুতিনের জন্য একটি স্পষ্ট সামরিক বিজয় এখন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোর্স : ক্ল্যাশ রিপোর্ট
