বাগেরহাটের ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে বর্তমানে দেশীয় প্রকৌশলীদের বড় ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ১৬ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত আমার দেশ-এর এক প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত এক বছরে কেন্দ্রটি প্রায় ৩০ বার বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ বার বন্ধ হওয়ার পেছনে কারিগরি ত্রুটি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বারবার যন্ত্রপাতিতে সমস্যা দেখা দেওয়া এবং মেরামতের পরও একই ধরনের ত্রুটি ফিরে আসায় কেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের ৫০:৫০ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত। ২০১০ সালে প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি গঠন করা হয়। প্রকল্পের অর্থায়নে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়া হয়। নির্মাণকাজে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়েছে, নির্মাণপর্বে ২ হাজারের বেশি ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন। একজন ভারতীয় প্রকৌশলী মাসে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে একই পর্যায়ের বাংলাদেশি প্রকৌশলীর বেতন ১ লাখ টাকারও কম ছিল বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। এ ধরনের বেতন বৈষম্য নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান এবং উচ্চ আদালতে রিটের বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজেও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ছিল। মোংলা বন্দর থেকে রামপাল পর্যন্ত নৌপথ উন্নয়নে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ড্রেজিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া কাজ করে, যার চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ১১৯ কোটি টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে কর্মীদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাননি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন কেন্দ্রটির কারিগরি স্থায়িত্ব নিয়ে। যন্ত্রপাতি দ্রুত ক্ষয়, ঘন ঘন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পুনরাবৃত্ত ত্রুটি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০ বছর পরিকল্পিত আয়ুষ্কালের প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। তবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী বা অনিয়মের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। প্রকৃত কারণ নির্ধারণে স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ ক্রয়-প্রক্রিয়া নিরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২৪ জানুয়ারি ৯ জন ভারতীয় কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় এলে প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
