ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্রদের মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি কমে যায়নি; বরং মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িকভাবে অগ্রাধিকার বাড়ার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
জাপানে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র সক্রিয় বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এর আগে প্রায় ৯ মাস ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিল ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার কারণে আব্রাহাম লিংকনে খাবারের সংকট, নষ্ট শৌচাগার ও ঝরনাসহ নানা সমস্যার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশও চলতি বছরের শুরুতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সামরিক সরঞ্জাম ইরানসংক্রান্ত কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়ংয়ের মতে, এ ধরনের সামরিক পুনর্বিন্যাস এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সাময়িক দুর্বলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে নিজেদের সামুদ্রিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। চীনের ‘লিয়াওনিং’ ও ‘শানডং’ বিমানবাহী রণতরী ওই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমায় চীনা উপকূলরক্ষী বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চীন একই সঙ্গে তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনকে কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে এবং এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাও পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখনো ব্যাপক। প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের অধীনে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক সদস্য এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতেও মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও ইরানের মতো হুমকি মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে তাইওয়ান ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৮% বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে এবং ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৪% করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মনোযোগ বাড়ায় এশিয়ায় সাময়িক কৌশলগত চাপ তৈরি হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে সামরিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠছে। এই সাময়িক ব্যবধান কাজে লাগিয়ে চীন কতটা কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার এশীয় মিত্রদের সঙ্গে কত দ্রুত ভারসাম্য পুনর্গঠন করতে পারে—সেটিই আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
