বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যুদ্ধ সক্ষমতা আরও একধাপ এগিয়ে গেল। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান NORINCO (China North Industries Corporation) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত দ্বিতীয় রেজিমেন্টের VT-5 লাইট ট্যাংক সফলভাবে সরবরাহ সম্পন্ন করেছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চূড়ান্ত হওয়া এই ক্রয়চুক্তির আওতায় সর্বশেষ চালানটি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে পৌঁছেছে।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহরে বর্তমানে মোট ৮৮টি VT-5 লাইট ট্যাংক যুক্ত হয়েছে, যা দুটি পূর্ণাঙ্গ রেজিমেন্টে বিভক্ত। ফলে দেশের সাঁজোয়া বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা, দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা এবং সীমান্ত প্রতিরক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দ্বিতীয় রেজিমেন্ট সরবরাহ সম্পন্ন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় রেজিমেন্টের VT-5 ট্যাংক সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে হওয়া সম্পূর্ণ চুক্তির বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে। প্রথম রেজিমেন্টের ট্যাংক পূর্বেই সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিল। সর্বশেষ চালান যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন দুটি পূর্ণাঙ্গ VT-5 রেজিমেন্ট পরিচালনা করছে।
VT-5 মূলত একটি আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের (Third Generation) লাইট ট্যাংক, যা পাহাড়ি এলাকা, নদীবহুল অঞ্চল এবং নরম মাটির ভূখণ্ডে কার্যকর যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অত্যন্ত উপযোগী বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মত।
কেন VT-5 গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে ভারী প্রধান যুদ্ধ ট্যাংকের (Main Battle Tank) তুলনায় অপেক্ষাকৃত হালকা ও দ্রুতগতির ট্যাংকের কার্যকারিতা বেশি। দেশের বিস্তীর্ণ নদীনালা, চরাঞ্চল, হাওর, সমতল ও পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত চলাচল এবং অপারেশন পরিচালনার জন্য VT-5 বিশেষভাবে উপযোগী।
এই ট্যাংকগুলো—
সীমান্ত এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
সাঁজোয়া রিকনেসান্স (Armoured Reconnaissance) পরিচালনা করতে সক্ষম।
পদাতিক বাহিনীকে দ্রুত ফায়ার সাপোর্ট দিতে পারে।
দ্রুত আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
নদীবহুল ও দুর্গম ভূখণ্ডে উচ্চ গতিশীলতা বজায় রাখতে পারে।
VT-5 লাইট ট্যাংকের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
VT-5 আধুনিক ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি একটি উন্নত লাইট ট্যাংক। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
ক্রু: ৩ জন
ওজন: প্রায় ৩৩–৩৬ টন (কনফিগারেশনভেদে পরিবর্তনশীল)
প্রধান অস্ত্র: ১০৫ মিমি রাইফেলড কামান
সহায়ক অস্ত্র: ৭.৬২ মিমি কো-অ্যাক্সিয়াল মেশিনগান
ইঞ্জিন: ৭৫০–১,০০০ হর্সপাওয়ার ডিজেল ইঞ্জিন (রপ্তানি কনফিগারেশনভেদে)
সর্বোচ্চ গতি: প্রায় ৭০ কিমি/ঘণ্টা
অপারেশনাল রেঞ্জ: প্রায় ৫০০ কিমি
সাসপেনশন: হাইড্রোপনিউম্যাটিক
ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম: ডিজিটাল ব্যালিস্টিক কম্পিউটারসহ আধুনিক Fire Control System
সুরক্ষা: মডুলার কম্পোজিট আর্মার
এছাড়া ট্যাংকটিতে উন্নত নাইট ভিশন, থার্মাল ইমেজিং এবং চলন্ত অবস্থায়ও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য কৌশলগত গুরুত্ব
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, VT-5 যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
১. সীমান্ত প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হবে
দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এই ট্যাংক সীমান্ত অঞ্চলে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
২. নদীবহুল এলাকায় অপারেশন সহজ হবে
বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতিতে ভারী ট্যাংকের তুলনায় VT-5 অনেক বেশি কার্যকর।
৩. দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী গঠন
সংকটময় পরিস্থিতিতে দ্রুত সাঁজোয়া ইউনিট মোতায়েন সম্ভব হবে।
৪. আধুনিকীকরণ কর্মসূচিতে অগ্রগতি
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি Forces Goal 2030 আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সংযোজনকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ। যুদ্ধজাহাজ, প্রশিক্ষণ বিমান, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।
NORINCO-এর মাধ্যমে VT-5 সরবরাহ সেই সহযোগিতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন দেশ বর্তমানে তাদের স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণে জোর দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও ধাপে ধাপে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সাঁজোয়া যান, আর্টিলারি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, VT-5 লাইট ট্যাংক সংযোজন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করে তুলবে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো দ্রুতগতির স্থল অভিযানে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
দ্বিতীয় রেজিমেন্টের VT-5 লাইট ট্যাংক সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহরে এখন মোট ৮৮টি VT-5 যুক্ত হয়েছে। এটি শুধু নতুন যুদ্ধ সরঞ্জাম সংযোজন নয়; বরং সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এই লাইট ট্যাংকগুলো ভবিষ্যতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৌশলগত অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তথ্যসূত্র-
BDMilitary Research & Defence Intelligence
NORINCO (China North Industries Corporation)-
